সমুদ্রের তলদেশের নতুন রহস্য।


 পৃথিবীতে “জীবন” বলতে আমরা সাধারণত এমন কিছুকেই বুঝি, যা নিজে শক্তি তৈরি করতে পারে, বংশবিস্তার করতে পারে এবং নিজের কোষীয় কাজগুলো নিজেই চালাতে পারে। কিন্তু সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা এমন এক অদ্ভুত অণুজীবের সন্ধান পেয়েছেন, যা এই পরিচিত সংজ্ঞাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর নাম রাখা হয়েছে Sukunaarchaeum mirabile — জাপানি লোককথার ক্ষুদ্র এক দেবতার নাম থেকে নেওয়া। কানাডা ও জাপানের গবেষকরা সমুদ্রে ভাসমান প্ল্যাঙ্কটনের ডিএনএ বিশ্লেষণ করার সময় হঠাৎ এমন এক জিনগত নকশা দেখতে পান, যা আগে কখনও দেখা যায়নি। প্রথমে এটি ভাইরাস বলে মনে হলেও পরে বোঝা যায়, এটি আসলে আর্কিয়া নামের এক প্রাচীন জীবগোষ্ঠীর সদস্য। আর্কিয়া হলো সেই রহস্যময় অণুজীব, যাদেরকে পৃথিবীর প্রাচীনতম জীবনের উত্তরসূরি মনে করা হয় এবং যাদের থেকেই কোটি কোটি বছর আগে জটিল প্রাণের বিবর্তনের পথ খুলেছিল।


সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই জীবটির জিনোম বা জিনগত নকশা এতটাই ছোট এবং সংকুচিত যে এটি নিজের প্রয়োজনীয় কাজগুলোর প্রায় কিছুই নিজে করতে পারে না। সাধারণ কোষের মতো এটি নিজে শক্তি উৎপাদন করতে পারে না, পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারে না, এমনকি বেঁচে থাকার বহু মৌলিক প্রক্রিয়াও চালাতে পারে না। সে কারণে এটি নিজের হোস্ট বা আশ্রয়দাতা জীবের উপর প্রায় পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই বৈশিষ্ট্য ভাইরাসের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। ভাইরাসও নিজেরা স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে না; তারা অন্য জীবের কোষ দখল করে নিজেদের প্রতিলিপি তৈরি করে। কিন্তু *Sukunaarchaeum mirabile* পুরোপুরি ভাইরাসও নয়, কারণ এর মধ্যে এখনো কিছু কোষীয় বৈশিষ্ট্য টিকে আছে। যেন এটি জীবনের দুই জগতের মাঝখানে আটকে থাকা এক বিবর্তনীয় ছায়া।


বিজ্ঞানীদের মতে, এই আবিষ্কার হয়তো আমাদের জীবনের উৎপত্তি সম্পর্কেও নতুন ধারণা দিতে পারে। পৃথিবীতে প্রথম জীবগুলো কেমন ছিল, তারা কতটা স্বাধীন ছিল, কিংবা ভাইরাস ও কোষীয় জীবের সীমারেখা কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ — এই প্রশ্নগুলো বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানের অন্যতম বড় রহস্য। Sukunaarchaeum সেই ধূসর অঞ্চলটাকেই সামনে এনে দিয়েছে। গবেষকদের ধারণা, কোটি কোটি বছরের বিবর্তনের মাধ্যমে এই জীবটি তার অপ্রয়োজনীয় জিন হারিয়ে ফেলেছে এবং কেবল বংশবিস্তার বা প্রতিলিপি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অংশগুলো রেখে দিয়েছে। অর্থাৎ, এটি যেন “জীবনের ন্যূনতম সংস্করণ”। এমন জীবের অস্তিত্ব প্রমাণ করে যে প্রকৃতি সবসময় আমাদের কল্পনার চেয়েও বেশি জটিল এবং জীবনকে হয়তো আমরা এতদিন খুব সরলভাবে সংজ্ঞায়িত করেছি।


এই আবিষ্কারের প্রযুক্তিগত ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্বও বিশাল। আধুনিক জীববিজ্ঞান, জেনেটিক্স এবং এমনকি মহাকাশবিজ্ঞানেও এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ বিজ্ঞানীরা যখন অন্য গ্রহে জীবনের সন্ধান করেন, তখন তারা মূলত পৃথিবীর পরিচিত জীবনের বৈশিষ্ট্য ধরেই অনুসন্ধান চালান। কিন্তু যদি জীবনের এমন অদ্ভুত মধ্যবর্তী রূপ সত্যিই থেকে থাকে, তাহলে হয়তো ভিনগ্রহের প্রাণও আমাদের কল্পনার বাইরে হতে পারে। একই সঙ্গে এই গবেষণা সিন্থেটিক বায়োলজি বা কৃত্রিম জীব তৈরির ক্ষেত্রেও নতুন প্রশ্ন তুলছে। একটি জীবের টিকে থাকার জন্য ঠিক কতটুকু জিন প্রয়োজন? কোন পর্যায়ে গিয়ে একটি কোষ আর “স্বাধীন জীবন” থাকে না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ভবিষ্যতের বায়োটেকনোলজি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।


তবে এখনো অনেক অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। গবেষণাটি আপাতত প্রিপ্রিন্ট সার্ভার bioRxiv এ প্রকাশিত হয়েছে, অর্থাৎ এটি এখনো পূর্ণ পিয়ার রিভিউ প্রক্রিয়া শেষ করেনি। ফলে বিশ্বের অন্যান্য বিজ্ঞানীরা এখন আরও পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন যে এই জীবটি ঠিক কীভাবে কাজ করে এবং এটি সত্যিই জীবনের নতুন কোনো শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে কিনা। তবুও একথা নিশ্চিত যে *Sukunaarchaeum mirabile* আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্যগুলো এখনো অদৃশ্য ক্ষুদ্র জগতের ভেতর লুকিয়ে আছে। হয়তো জীবনকে আমরা এখনো পুরোপুরি বুঝতেই পারিনি।


তথ্যসূত্র : “A cellular entity retaining only its replicative core: Hidden archaeal lineage with an ultra-reduced genome” — bioRxiv, 2025

মন্তব্যসমূহ

জনপ্রিয় পোস্টসমূহ